বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, ০৯:০৪ অপরাহ্ন

গুটিয়ে আনা হচ্ছে রিজার্ভের তহবিল

গুটিয়ে আনা হচ্ছে রিজার্ভের তহবিল

বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে রিজার্ভের অর্থে গঠিত অভ্যন্তরীণ ঋণ তহবিলগুলোর কার্যক্রম গুটিয়ে আনছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরই মধ্যে রিজার্ভের অর্থে গঠিত বৈদেশিক মুদ্রার গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড (জিটিএফ) থেকে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিলের (বিআইডিএফ) কোনো প্রকল্পেও নতুন করে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না। রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) চালু থাকলেও পর্যায়ক্রমে এর আকারও কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ইডিএফের সুদের হার বাড়ানোসহ যথাসময়ে ঋণ আদায়ে জোর দেওয়া হয়েছে।

চলমান ডলার সংকটে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখা এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ঋণ পাওয়ার শর্তপূরণে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকসূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলসহ সব ধরনের পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি এবং ডলারের উচ্চমূল্যের কারণে আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই দেশে ডলারের সংকট চলছে। গত এপ্রিল থেকে এই সংকট তীব্র হয়েছে। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পদক্ষেপে চলতি অর্থবছরে আমদানি ব্যয়ে কিছুটা লাগাম টানা গেলেও ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক আয় সংগ্রহের

উৎসে ভাটা পড়ায় ডলার সংকট আরও প্রকট হচ্ছে। এতে রিজার্ভের ওপর ক্রমশ চাপ বাড়ছে। এই চাপ সামাল দিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা নিতে চাইছে বাংলাদেশ। এ ঋণের বিষয়ে ইতিবাচক সাড়াও মিলেছে। এ ক্ষেত্রে দাতা সংস্থাটির পক্ষ থেকে বেশ কিছু শর্ত ও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যা ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছে সরকার।

আইএমএফ থেকে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় কমিয়ে আনা, ব্যাংক ও রাজস্ব খাতে সংস্কার, রিজার্ভের হিসাবায়ন পদ্ধতি পরিবর্তন, ইডিএফের আকার কমানো, বিআইডিএফের নতুন কোনো প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ বন্ধ রাখাসহ বিভিন্ন পরামর্শ ও শর্ত দেওয়া হয়েছে। এসব শর্ত ধাপে ধাপে মেনে নেওয়ার বিষয় সম্মত হয় বাংলাদেশ। এরই মধ্যে আইএমএফের নিয়মে রিজার্ভের হিসাবায়ন পদ্ধতি অনুসরণসহ বেশ কিছু শর্ত মানার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভর্তুকি কমিয়ে আনতে এর দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক খাতের তথা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণের বিষয়ে গত ২৬ অক্টোবর থেকে ৯ নভেম্বর পর্যন্ত আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক করে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, আইএমএফ যেসব পরামর্শ বা শর্ত দিয়েছে, সেগুলো নতুন কোনো বিষয় না। এগুলো দেশের স্বার্থের পরিপন্থীও নয়। সরকারও এগুলো অস্বীকার করছে বা এই পরামর্শগুলো ঠিক নয়, এমন কথা কখনো বলেনি। তবে প্রশ্ন হচ্ছেÑ এসব বিষয়ে কাজ হচ্ছে কিনা। যদি পরামর্শগুলো গ্রহণ করে, সেগুলো বাস্তবায়নের পদক্ষেপ থাকে এবং সে অনুযায়ী কাজ হয়, তা হলে দেশের অর্থনীতির জন্যই ভালো হবে।

গত বছরের আগস্টে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ প্রথমবার ৪৮ বিলিয়ন বা চার হাজার ৮০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছিল। এটি কমতে কমতে এখন ৩৩ বিলিয়ন বা তিন হাজার ৩০০ কোটি ডলারের ঘরে নেমে এসেছে। যদিও ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ আরও ৮০০ কোটি ডলার কম। জানা যায়, রিজার্ভ থেকে ৭০০ কোটি ডলার দিয়ে গঠন করা হয়েছে ইডিএফ। এ ছাড়া রিজার্ভের ২০ কোটি ডলার অর্থে গঠন করা হয়েছে গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড (জিটিএফ)। বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশের যৌথ অর্থায়নে গঠিত লং টার্ম ফাইন্যান্সিং ফান্ডে (এলটিএফএফ) রিজার্ভ থেকে দেওয়া হয়েছে তিন কোটি ৮৫ লাখ ডলার। বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিলের (বিআইডিএফ) আওতায় পায়রাবন্দরে অনুকূলে দেওয়া হয়েছে ৬৪ কোটি ডলার। এর বাইরে রিজার্ভ থেকে উড়োজাহাজ কিনতে বাংলাদেশ বিমানকে চার কোটি ৮০ লাখ ডলার এবং শ্রীলংকাকে ২০ কোটি ডলার ঋণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক আমাদের সময়কে বলেন, আইএমএফের পরামর্শ ছিলÑ রিজার্ভের অর্থে গঠিত তহবিলগুলো আলাদা করে দেখানো। কিন্তু এসব তহবিল বন্ধ করে দেওয়ার কোনো শর্ত তারা দেয়নি। তাই আইএমএফের শর্ত মেনে জিটিএফ থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় পুনঃঅর্থায়ন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এমনটি নয়। চলমান ডলার সংকটের কারণে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। তবে গ্রাহকরা যাতে আগের মতো বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ সুবিধা পায়, সে জন্য দেশীয় মুদ্রায় আরেকটি জিটিএফ তহবিল গঠন করা হয়েছে। এ তহবিল থেকে ব্যাংকগুলো কর্তৃক সংশ্লিষ্ট খাতের গ্রাহকদের বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থায়নের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রায় (টাকা) পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

জিটিএফ থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় পুনঃঅর্থায়ন বন্ধ : বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ দিয়ে ২০১৬ সালে ‘গ্রিন ট্রান্সফরমেশন তহবিল’ গঠন করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স বিভাগের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এ তহবিলে আকার ২০ কোটি ডলার। এ তহবিল থেকে অর্থ নিয়ে ব্যাংকগুলো রপ্তানিমুখী বস্ত্র ও চামড়া খাতের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ৫ থেকে ১০ বছর মেয়াদে অর্থায়ন করতে পারে। এই অর্থ দ্বারা সবুজ ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি করা যায়। তবে গত মাস থেকে এই তহবিল থেকে আর কোনো পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা প্রদান না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ পর্যন্ত এ তহবিল থেকে ১৪ কোটি ডলার পুনঃঅর্থায়ন করা হয়েছে।

স্থানীয় মুদ্রায় নতুন তহবিল : রপ্তানি ও উৎপাদনমুখী শিল্প খাতে পরিবেশবান্ধব মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে সহজশর্তে ও কম সুদে ঋণ দেওয়ার জন্য সম্প্রতি পাঁচ হাজার কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ তহবিলের নাম দেওয়া হয়েছে স্থানীয় মুদ্রায় গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড (জিটিএফ)। পরিবেশবান্ধব মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে এ খাতের গ্রাহকরা ব্যাংকগুলো থেকে বৈদেশিক মুদ্রাই ঋণ পাবেন। আর ওই ঋণের বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়ন পাবে দেশের ব্যাংকগুলো। এ ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার হবে ৫ শতাংশ।

বিআইডিএফেও নতুন অর্থ বরাদ্দ বন্ধ : দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে রিজার্ভ ব্যবহারের জন্য ২০২১ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিল (বিআইডিএফ) গঠন করে সরকার। ঘূর্ণয়মান এই তহবিল থেকে বছরে দুই বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। প্রাথমিকভাবে শুধু বন্দর ও বিদ্যুৎ খাতের সরকারি প্রকল্পে এ তহবিল থেকে অর্থায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই সময়ই এ তহবিল থেকে অর্থায়নের জন্য পায়রাবন্দরের রামনাবাদ চ্যানেলের ক্যাপিটাল ও মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং শীর্ষক প্রকল্পে রিজার্ভ থেকে ৬৪ কোটি ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বরাদ্দ করা হয়। এর পর থেকে বিআইডিএফের কোনো প্রকল্পে রিজার্ভ থেকে অর্থ বরাদ্দ বন্ধ রাখা হয়েছে। আইএমএফও এ পরামর্শ দিয়েছে।

ইডিএফের আকার কমানোর সিদ্ধান্ত, সুদহার বৃদ্ধি : রপ্তানি শিল্পের বিকাশ ও প্রসারের জন্য সহজশর্তে ঋণ দিতে ১৯৮৯ সালে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল গঠিত হয়। মাত্র এক কোটি ৫০ ডলার নিয়ে গঠিত এ তহবিলের আকার বাড়তে বাড়তে এখন ৭০০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়েছে। ইডিএফ থেকে রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রয়োজনীয় উপকরণ আমদানির জন্য ঋণ দেওয়া হয়।

সূত্র জানিয়েছে, আইএমএফের পরামর্শ অনুযায়ী, রিজার্ভের অর্থে গঠিত ইডিএফের আকার ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ইডিএফ থেকে আগের মতো ঢালাও ঋণ দেওয়া হচ্ছে না। এর পরিবর্তে সময়মতো ইডিএফের টাকা ফেরত আনতে ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

জানা যায়, এক সময় লন্ডন ইন্টার ব্যাংক অফার রেটের (লাইবর) সঙ্গে ইডিএফের ঋণের সুদহার নির্ধারিত হতো। করোনার প্রভাব শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত ছয় মাসের গড় লাইবরের সঙ্গে দেড় শতাংশ যোগ করে হারে সুদহার নির্ধারিত হতো। তবে করোনা ভাইরাসের প্রভাব শুরুর পর তহবিল খরচ কমাতে প্রথম দফায় ২ শতাংশ সুদ নির্ধারণ করা হয়। এর পর গত ২০ জুলাই সুদের হার বাড়িয়ে ৩ শতাংশ করা হয়। আর সবশেষে গত মাসে সুদের হার আরও ১ শতাংশ বাড়িয়ে ৪ শতাংশ নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ১৩ নভেম্বর থেকে এই নতুন সুদহার কার্যকর হয়েছে।

এলটিএফের বকেয়া আদায়েও জোর : দেশের উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী শিল্পকে বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ দিতে ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে ২৯ কোটি ১০ লাখ ডলারের লং টার্ম ফাইন্যান্সিং ফ্যাসিলিটি শীর্ষক এই প্রকল্প চালু করা হয়। এতে বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নের পরিমাণ ছিল মাত্র তিন কোটি ৮৫ লাখ ডলার, যা রিজার্ভ থেকে দেওয়া হয়। ২০২১ সালের মার্চে এই ফান্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আর বাড়ানো হয়নি। এখন শুধু ঋণ আদায় কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সম্প্রতি এই তহবিলের অর্থ আদায় জোরদারেও ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ফেসবুকে সংবাদটি শেয়ার করুন




© All rights reserved © 2017 আলোকিত ভোরের বার্তা
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com